| | |

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

উত্তর সাতকানিয়া ও দোহাজারী নিয়ে বিরোধ নয়, সমতা ও জনস্বার্থই হোক সিদ্ধান্তের ভিত্তি

আমিও উত্তর সাতকানিয়ার পক্ষে। উত্তর সাতকানিয়ার জন্য আমারও সামান্য ঘাম, শ্রম ও অবদান রয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে একটি নতুন প্রশাসনিক উপজেলা গঠনের প্রশ্নে আমি মনে করি, শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দাবি নয়, সংশ্লিষ্ট সব এলাকার মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াতের সুবিধা, প্রশাসনিক সেবা প্রাপ্তি এবং দীর্ঘদিনের জনদাবিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
আমরা যারা উত্তর সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নের বাসিন্দা, তাদের জন্য সাতকানিয়া থানা ও উপজেলা সদরে গিয়ে প্রশাসনিক ও সরকারি সেবা গ্রহণ করা ভৌগোলিকভাবে যেমন দূরত্ব ও যাতায়াতের অসুবিধার কারণে কষ্টকর, ঠিক তেমনি দোহাজারী পৌরসভা ও ধোপাছড়ী ইউনিয়নের মানুষের জন্যেও চন্দনাইশ থানা ও উপজেলা সদরে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণে বাস্তব ভোগান্তি রয়েছে। এ কারণে দোহাজারী ও ধোপাছড়ীবাসীও দীর্ঘদিন ধরে পৃথক থানা ও উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো, একটি এলাকার মানুষের ভোগান্তি দূর করতে গিয়ে অন্য একটি এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিকে আমরা কি উপেক্ষা করতে পারি? আমার বিবেচনায়, উভয় অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য দাবিকে সমন্বয় করে এমন একটি সমাধান খোঁজা উচিত, যাতে প্রশাসনিক সেবা মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছায় এবং কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের বঞ্চিত মনে না করে।
উত্তর সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নের সঙ্গে দোহাজারী পৌরসভা ও ধোপাছড়ী ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্ত করে মোট সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে নতুন একটি উপজেলা গঠন করা হোক। আর উপজেলা সদর হিসেবে বিওসির মোড়কে বিবেচনায় নেওয়া হোক।
আমার ধারণা, বিওসির মোড়কে উপজেলা সদর করার প্রস্তাবটি গুরুত্বসহকারে যাচাই করা হলে সাংগু নদী ঘেঁষে পর্যটন স্পটের মত যে পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে তা সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের যাতায়াত, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় যোগাযোগস্থল হিসেবে যে উপযোগী হবে, তা অবশ্যই সড়ক যোগাযোগ, দূরত্ব, জনসংখ্যা, সরকারি দপ্তর স্থাপনের সুযোগ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে যাচাই করা যেতে পারে।
এভাবে নতুন উপজেলা গঠন করা হলে চট্টগ্রাম-১৪ সংসদীয় এলাকাটি দুটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত হতে পারত। একই সঙ্গে দুই উপজেলার ইউনিয়ন ও পৌরসভার সংখ্যার মধ্যে একটি সুন্দর সাংগঠনিক সমতা বজায় রাখা সম্ভব হতো।
তখন চন্দনাইশ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা হতো
যেমন
১. কাঞ্চনাবাদ ইউনিয়ন
২. জোয়ারা ইউনিয়ন
৩. বরকল ইউনিয়ন
৪. বরমা ইউনিয়ন
৫. বৈলতলী ইউনিয়ন
৬. সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন
৭. হাশিমপুর ইউনিয়ন
এবং চন্দনাইশ পৌরসভা।
অন্যদিকে, আমার প্রস্তাবিত নতুন উপজেলায় সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা থাকত। ইউনিয়নগুলো হলো—
১. কালিয়াইশ ইউনিয়ন
২. কেওচিয়া ইউনিয়ন
৩. বাজালিয়া ইউনিয়ন
৪. পুরানগড় ইউনিয়ন
৫. ধর্মপুর ইউনিয়ন
৬. খাগরিয়া ইউনিয়ন
৭. ধোপাছড়ী ইউনিয়ন
এবং দোহাজারী পৌরসভা।
অর্থাৎ, প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে উভয় উপজেলায় সাতটি করে ইউনিয়ন ও একটি করে পৌরসভা থাকত। আমার কাছে এটি একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাব। তবে শুধু সংখ্যাগত সমতা থাকলেই হবে না; জনসংখ্যা, আয়তন, রাজস্ব, যোগাযোগব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যও নিশ্চিত করতে হবে। আমার বক্তব্য হলো, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবটি অন্তত নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।
এবার আসি নামকরণের বিষয়ে:
দোহাজারীবাসী নতুন থানা ও উপজেলার নাম দোহাজারীর নামে হোক—এমন দাবি করতেই পারেন। একইভাবে উত্তর সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়নের মানুষ উত্তর সাতকানিয়া নামেই থানা ও উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানালে সেটিও তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক। নিজ নিজ এলাকার পরিচয়, ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতি মানুষের আবেগ থাকা স্বাভাবিক। এ নিয়ে কাউকে দোষারোপ করারও কোনো কারণ নেই।
কিন্তু যখন একটি অভিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের প্রশ্নে দুটি পক্ষেরই নিজস্ব নামের দাবি রয়েছে, তখন এমন একটি নাম বিবেচনা করা যেতে পারে, যা কোনো পক্ষের একক পরিচয়কে প্রাধান্য না দিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক নামকরণে নদীর নামও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন কর্ণফুলী নদীর নামে কর্ণফুলী উপজেলা রয়েছে। হালদা নদীর নামেও হাটহাজারী এলাকায় হালদা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে মাতামুহুরী নামেও থানা হয়েছে ইমিডিয়েটলি।
সেই দৃষ্টান্ত ও স্থানীয় ভৌগোলিক পরিচয় বিবেচনায় আমার প্রস্তাব, দীর্ঘদিন ধরে প্রবহমান আমাদের পরিচিত সাংগু নদীর নাম অনুসারে নতুন উপজেলার নাম ‘সাংগু উপজেলা’ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হোক।
আমার বিশ্বাস, উত্তর সাতকানিয়া কিংবা দোহাজারী—কোনো একটি পক্ষের নামকে প্রাধান্য না দিয়ে সাংগু নদীর নামে নামকরণের প্রস্তাবটি আলোচনায় আনা হলে তা একটি নিরপেক্ষ বিকল্প হতে পারে। এতে দুই পক্ষেরই নিজস্ব নামকরণের দাবি থেকে সরে এসে বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ঐকমত্যে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ নামের ভৌগোলিক প্রাসঙ্গিকতা, প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা ও সরকারি নামকরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যও যাচাই করা যেতে পারে।
এবার আমার নিজের ইউনিয়ন খাগরিয়ার প্রসঙ্গে আসি।
যদি উত্তর সাতকানিয়ার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে দোহাজারীকে বাদ দিয়ে নতুন উপজেলা গঠন করা হয়, তাহলে আমার খাগরিয়া ইউনিয়নের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি অনেকটা ‘যে লাউ, সেই কদু’ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমাদের খাগরিয়া ইউনিয়নের মোট নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি ওয়ার্ড—মৈশামুড়া মৌলভীর দোকান দিয়ে যাতায়াতের একটি ভিন্ন বাস্তবতা থাকলেও বাকি আটটি ওয়ার্ডের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দৈনন্দিন চলাচল ও বিভিন্ন প্রয়োজনে দোহাজারী হয়ে যাতায়াত করতে হয়।
আমাদের অনেকের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দোহাজারী বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে ওৎপোতভাবে জড়িত। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করা থেকে শুরু করে বাজার-সদাই ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা—অনেক কিছুই করতে হয় দোহাজারীকে কেন্দ্র করে। আবার সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলেও দিনের বড় একটি অংশ কাটে দোহাজারীতে অবস্থান করেই।
এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা নয়; বরং খাগরিয়ার মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজারব্যবস্থা ও জীবনযাত্রার সঙ্গে দোহাজারীর যে বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের আলোচনায় বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
তাই আমার প্রশ্ন, যে এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, যাতায়াত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দোহাজারীকেন্দ্রিক, তাদের বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধু ছয়টি ইউনিয়নকে নিয়ে উপজেলা গঠন করলে তাদের ভোগান্তি কতটা কমবে? নতুন উপজেলা গঠনের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, তাহলে মানুষের প্রকৃত চলাচলের পথ, যোগাযোগের কেন্দ্র ও দৈনন্দিন প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া কি উচিত নয়?
আমার বক্তব্য কোনো এলাকার বিরুদ্ধে নয়।
আমি জানি, আমি একজন পরাজিত ও অথর্ব মানুষ। আমার কথা হয়তো কেউ রাখবেন না। তবুও নিজের মনের কোণে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কথাগুলো আরেকবার তুলে ধরলাম। ১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে আমি আমার এই মনোভাব প্রকাশ করে আসছি। আজও একই বিশ্বাস থেকে বিষয়টি শেষবারের মতো সবার সামনে তুলে ধরছি।
হয়তো আমার এই লেখাটুকু পড়েই উত্তর সাতকানিয়া ও দোহাজারীর অনেক ভাই আমাকে গালাগালি করবেন। কেউ হয়তো আমার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হবেন না, কেউ হয়তো কঠোর সমালোচনাও করবেন। সব জেনেশুনেই আমি আমার মতামত প্রকাশ করছি। কারণ, মতামত প্রকাশ করা আমার অধিকার। তবে আমার মতামতই চূড়ান্ত হতে হবে, এমন দাবি আমার নেই।
আমি শুধু চাই, বিষয়টি আবেগ, ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা একে অপরকে প্রতিপক্ষ মনে করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং যুক্তি, তথ্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বৃহত্তর জনস্বার্থের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হোক।
উত্তর সাতকানিয়ার মানুষ তাদের এলাকার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা চান—এটি ন্যায্য প্রত্যাশা। দোহাজারী ও ধোপাছড়ীর মানুষও নিজেদের প্রশাসনিক সেবা সহজ করতে চান—এটিও ন্যায্য প্রত্যাশা। একইভাবে খাগরিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও বাস্তব প্রয়োজনের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা।
আমাদের কথাগুলো হোক বিদ্বেষবিহীন, যৌক্তিক ও অহিংস।
পৃথিবী ছোট। আমাদের চট্টগ্রাম-১৪ সংসদীয় এলাকাও আয়তনের দিক থেকে তুলনামূলক আরো ছোট। এখানে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত দেখা-সাক্ষাৎ হয়, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে এবং একে অপরের সঙ্গে চলতে হয়।
আজ প্রশাসনিক সীমানা কিংবা উপজেলার নাম নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট না করে, ভাইয়ে ভাইয়ে বিভেদ সৃষ্টি না করে কিংবা দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
আমরা যেন যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দিই, তথ্যের জবাব তথ্য দিয়ে দিই এবং ভিন্নমতকে সম্মান করতে শিখি। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেটিই হোক, তা যেন মানুষের প্রকৃত কল্যাণ, সেবাপ্রাপ্তির সুবিধা ও ন্যায়সংগত বিবেচনার ভিত্তিতে গৃহীত হয়।
আমার প্রস্তাবের সঙ্গে কেউ একমত না হলেও তাঁর প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। একইভাবে আমার মতামতের সঙ্গে অন্য কেউ একমত না হলে তাঁর প্রতিও আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি শুধু চাই, আমাদের এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাটি হোক শান্তিপূর্ণ, তথ্যনির্ভর, পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ ও অহিংস।
চোখে চোখ পড়লে যেন আমাদের কারও লজ্জাবোধ করতে না হয়। মতের অমিল থাকলেও যেন আমরা একে অপরকে সম্মান করতে পারি—এটাই আমার প্রত্যাশা।
সকলকে জানাই আন্তরিক সালাম।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

ক্যাটাগরি